আজ শনিবার | ৩০ আগস্ট ২০২৫ | ১৫ ভাদ্র ১৪৩২ | ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৭ | বিকাল ৪:৫২

রাজনীতি ও শিক্ষা একসঙ্গে চলবে কিনা

ডান্ডিবার্তা | ৩০ আগস্ট, ২০২৫ | ৭:৪০ পূর্বাহ্ণ

আরিফুল সাজ্জাত
রাজনীতি ও শিক্ষা পরস্পরের পরিপূরক, নাকি বিরোধী? বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা প্রায়ই স্লোগান শুনতাম- ‘রাজনীতি ও সন্ত্রাস এক সাথে চলে না’। কোনো কোনো গোষ্ঠী এই স্লোগান খানিকটা পাল্টে বলত– রাজনীতি ও শিক্ষা এক সাথে চলে না! রাজনীতি ও শিক্ষার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে দুনিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষা আন্দোলন এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রতিরোধের দিকে তাকানো যেতে পারে। এটি খুবই স্বাভাবিক ধারণা, একটি রাষ্ট্র তার ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় জনশক্তি তৈরিতে যে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দক্ষ জনবল সৃষ্টি করে, সেটাকেই শিক্ষা ব্যবস্থা বলা যেতে পারে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমরা কখনোই তা করিনি বা করার চেষ্টাও ছিল না শাসককুলের মধ্যে। অনেকটা অ্যাডহক ভিত্তিতে মানে যখন যা সামনে আসে তা দিয়েই চলার চেষ্টা হয়েছে। ফলে কোনো শিক্ষা ব্যবস্থাই এখানে গড়ে ওঠেনি। উচ্চশিক্ষা হয়েছে জগাখিচুড়ি মার্কা। দেশের প্রয়োজনে খাতভিত্তিক জনশক্তি কিংবা বিদেশে শ্রমিক বা বিশেষায়িত মানবসম্পদ রপ্তানির কথা মাথায় রাখা হয়নি। ফল হয়েছে, শিক্ষার মানে রাষ্ট্রের প্রবঞ্চনা। বছর বছর তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েছে। তারা হতাশ হয়েছে দিনের পর দিন। যেভাবেই হোক, একটি চাকরি পেয়ে পরিবার ও সমাজকে ধন্য করেছে। বিপরীতে পেশাগত ক্ষেত্রে সব সময় মুখ ভার করে কাজ করেছে। অর্থাৎ যে খাতে যে জনবল দরকার, সেই খাতে সেই মানের মানুষ পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাক রপ্তানির কথা বলা যায়। আশির দশক থেকে এই খাতের উত্থান হলেও আমরা এখনও দক্ষ জনবল তৈরিতে ভালো মানের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। ফলে গার্মেন্টস সেক্টরে আমার শুধুই দর্জিবাড়ির মতো। এর মধ্যম বা উচ্চ পর্যায়ে কাজ করে বিদেশিরা। ফ্যাশনের ডিজাইনও আসে বিদেশ থেকে। এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি চার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের হাওয়া বইছে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ডাকসু নির্বাচন নিয়ে চলছে বেশ মাতামাতি। দলীয় প্যানেলের বাইরে ভোটে লড়ছে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থীরা। তারা সামনে আনছে একাডেমিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা। কেউ কেউ বলছে স্টুডেন্ট অটোনমির কথা। মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নিজস্ব ঢঙে তাদের মত কিংবা পরিকল্পনা রাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরতে চায়। সেটা কী নিয়ে? আবাসন সমস্যার সমাধান, একাডেমিক সিলেবাস প্রণয়ন ও তারা কীভাবে পড়তে চায়, সেসব তুলে ধরতে চায়। দলভিত্তিক ছাত্র সংগঠনগুলো কোনো না কোনো সময় মূল দলের মাধ্যমে ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে। আবার যারা পায়নি, তারা মতাদর্শিক লড়াই সামনে এনে ভুলে গেছে একাডেমিক উৎকর্ষ অর্জনের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় অনেক শিক্ষক তাদের শিক্ষার্থীদের জুনিয়র স্কলার বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এখানে স্বাধীনভাবে বিশ্বের যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে স্বাধীনভাবে আলোচনা হয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে এবং ভবিষ্যতের পাথেয় ঠিক করা হয়। এর মাধ্যমেই জ্ঞানচর্চার গতি সৃষ্টি হয়। একাত্তরে স্বাধীন দেশ পাওয়ার পর থেকে এই পরিবেশই আমরা দিতে পারিনি শিক্ষার্থীদের। বরং সবসময় ক্ষমতার পাহারাদার কিংবা নতুনভাবে যারা ক্ষমতায় যেতে চায়, তাদের জন্য পথ তৈরি করে দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এবার সময় এসেছে এ থেকে বের হওয়ার। তাহলে কি চিরাচরিত রাজনীতির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক থাকবে না? অবশ্যই আমরা সামনে যেতে চাই। রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশেষায়িত জ্ঞান ও উদ্ভাবনের সংকটে আমরা। কি প্রশাসন, চিকিৎসা, নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রকৌশল ও নির্মাণ কিংবা রাজনৈতিক দল পরিচালনায় দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি চোখে পড়ার মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আগে নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিক। তারপর যার যার পছন্দমতো খাতে অবদান রাখবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়া ছেলেমেয়েরা প্রাণ খুলে রাষ্ট্র নিয়ে ভাবুক; রাষ্ট্রের সংহতি নিয়ে গবেষণা করুক। একই সঙ্গে বিজ্ঞানপড়ুয়ারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিষয়গুলোতে নিজেকে ছাড়িয়ে যাক; অর্জন করুক বিশ্বমানের যোগ্যতা। এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের বাইরে বেরিয়ে এসেছে অনেক প্রার্থী। যারা দল ও নির্দিষ্ট কোনো মতাদর্শকে সামনে এনেছে, তারা সেই একই সুরে কথা বলছে। অর্থাৎ তাদের মূল দলের যে রাজনীতি, তার আলোকেই কথাবার্তা সামনে আনছে আর ভোট চাইছে। মাঝে মাঝে সেই দল ও মতাদর্শ কীভাবে ছাত্রদের কল্যাণ করতে পারে, সেই রেকর্ডার ছেড়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে পরিবেশের চাপে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিষয় নিয়ে প্রতিশ্রুতিও দিতে দেখা যাচ্ছে। ডাকসু কিংবা রাকসু নির্বাচন কি অতীতের মতো শুধু দলীয় ও মতাদর্শিক রাজনীতির আঁতুড়ঘর হয়ে থাকবে, নাকি নতুন সম্ভাবনার ঝিলিক দেবে– শিক্ষার্থীদের সামনে এখন এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময়। ইতিহাস চক্রাকারে ফিরবে, নাকি বিশ্ববীক্ষা অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করবে? বিশ্বের সঙ্গে এক কাতারে আসার চেষ্টা করবে? পুরো বিষয়টা করতে সিলেবাস, ফ্যাকাল্টি সৃষ্টি, শিক্ষকদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় জরুরি। আর সেটা যেন হয়, তার সুর তুলবে কারা? যেসব ছাত্রছাত্রী রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্রের জন্য বারবার রুখে দাঁড়িয়েছে, তারা এবার ভিন্ন বার্তা দিক নীতিনির্ধারক ও দেশবাসীকে। তেমনটা হলেই আমরা এগিয়ে যাব। তা না হলে আবারও একই বৃত্তে ফিরে যাবে বাংলাদেশ।
আরিফুল সাজ্জাত: সাংবাদিক ও সাবেক ছাত্রনেতা।




Your email address will not be published.

Comments are closed.


আজকের পত্রিকা
আজকের পত্রিকা
ফেসবুকে আমরা
পুরনো সংখ্যা
Copyright © Dundeebarta 2024
ডান্ডিবার্তা